
১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে জন্ম নেয় এক শিশু। নাম মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন। কয়েক দশক পর সেই শিশুই হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংগীতশিল্পী। গান, নাচ, পোশাক, মিউজিক ভিডিও-সবকিছুতেই নতুন ধারা তৈরি করে তিনি পরিচিতি পান ‘কিং অব পপ’ হিসেবে।
২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান মাইকেল জ্যাকসন। মৃত্যুর সময় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্ক ও আইনি জটিলতা ছিল। এর সঙ্গে ছিল বিপুল ঋণের বোঝা। কিন্তু মাইকেলের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। বরং মৃত্যুর পর যেন শুরু হয় তার আরেক অধ্যায়।
মৃত্যুর পর গত ১৭ বছরে তার গান, সংগীতের স্বত্ব, সিনেমা, মঞ্চ প্রযোজনা, লাইভ শো ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে আয় করেছে তার এস্টেট। সেই আয় তাকে মৃত তারকাদের মধ্যে সবচেয়ে সফলদের একজন করে তুলেছে।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে মাইকেলের মৃত্যুর পর থেকে তার এস্টেটের আয় ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। ২০২৫ সালের ফোর্বসের মৃত তারকাদের আয়ের তালিকায়ও শীর্ষে ছিলেন তিনি।
ওই এক বছরে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেটের আয় ছিল প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকার সমান।
অর্থাৎ মৃত্যুর ১৭ বছর পরও মাইকেলের নাম থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি আয় আসছে। তার গান ও সংগীতের স্বত্বের পাশাপাশি সিনেমা, মঞ্চনাট্য, লাইভ শো ও লাইসেন্সিং থেকেও আসছে বিপুল অর্থ।
আজকের এই বিপুল আয়ের সঙ্গে মাইকেলের মৃত্যুকালের আর্থিক অবস্থার ছিল বড় পার্থক্য। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় তার ওপর প্রায় ৪৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ ছিল।
তবে তার হাতে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ, সংগীতের স্বত্ব এবং নানা ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। নগদ অর্থের সংকট থাকলেও এসব সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব ছিল।
মাইকেলের মৃত্যুর পর তার এস্টেটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ঠিক সেই কাজটিই করেন। তার রেখে যাওয়া সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় মাইকেল জ্যাকসনের ‘দ্বিতীয় ক্যারিয়ার’।
মৃত্যুর আগে ‘দিস ইজ ইট’ নামে কনসার্ট সিরিজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাইকেল। কিন্তু তার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সেই কনসার্ট আর অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে তার মহড়া ও পর্দার পেছনের দৃশ্য নিয়ে তৈরি করা হয় চলচ্চিত্র ‘মাইকেল জ্যাকসনস দিস ইজ ইট’।
২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বক্স অফিসে আয় করে ২৬ কোটির বেশি ডলার। পরবর্তী সময়ে এর সংগীত, ডিভিডি ও বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকেও আয় হয়।
মাইকেলের মৃত্যুর পর তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই সিনেমা ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। ভক্তদের কাছে এটি ছিল প্রিয় শিল্পীকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ। ব্যবসার দিক থেকে এটি প্রমাণ করে, মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পরও তার নামের মূল্য এতটুকু কমেনি।
আরও পড়ুন
দ্বিতীয় সন্তান নেবেন অভিষেক-ঐশ্বরিয়া? যে কথায় লজ্জায় লাল অভিষেক
মাইকেলের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো সংগীতের স্বত্ব কেনা। ১৯৮৫ সালে প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে এটিভি নামের একটি সংগীত ক্যাটালগ কিনেছিলেন তিনি।
এই ক্যাটালগে প্রায় চার হাজার গানের স্বত্ব ছিল। এর মধ্যে জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনির লেখা বিটলসের বেশ কিছু জনপ্রিয় গানও ছিল।
সেসময় এই বিনিয়োগ নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে এটি সংগীত ব্যবসার ইতিহাসের অন্যতম সফল সিদ্ধান্তে পরিণত হয়।
পরে সনির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই ক্যাটালগের মূল্য আরও বাড়ে। ২০১৬ সালে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট নিজেদের অংশ সনির কাছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারে বিক্রি করে।
অর্থাৎ কয়েক কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ পরবর্তী সময়ে শত শত কোটি ডলারের সম্পদে পরিণত হয়।
আরও পড়ুন
দুর্যোগের মধ্যেই নেপাল ছাড়লেন অভিনেতা
মাইকেলের সংগীতের মূল্য মৃত্যুর পর কমেনি, বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ২০২৪ সালে তার এস্টেট নিজস্ব সংগীত, মাস্টার রেকর্ডিং ও প্রকাশনা অধিকার-সংক্রান্ত সম্পদের ৫০ শতাংশ অংশীদারত্ব সনির কাছে প্রায় ৬০ কোটি ডলারে বিক্রি করে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই চুক্তির ফলে মাইকেলের সংগীতসম্পদের মোট মূল্য প্রায় ১২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
চুক্তিটি নিয়ে অবশ্য পারিবারিক বিরোধও তৈরি হয়েছিল। মাইকেলের মা ক্যাথরিন জ্যাকসন এর বিরোধিতা করেছিলেন। পরে আদালত এস্টেট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
এই চুক্তি আরও একবার প্রমাণ করে, মৃত্যুর দেড় দশক পরও মাইকেল জ্যাকসনের সংগীতের স্বত্ব বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান বিনোদন সম্পদ।
মাইকেলের আয় শুধু গান ও অ্যালবামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার জীবন ও সংগীতকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে মঞ্চনাট্য ও স্থায়ী শো।
‘এমজে: দ্য মিউজিক্যাল’ মাইকেল জ্যাকসনের জীবন ও সংগীত নিয়ে তৈরি সফল মঞ্চ প্রযোজনা। ২০২২ সালে শুরু হওয়ার পর এটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর প্রযোজনা হয়েছে।
অন্যদিকে লাস ভেগাসে দীর্ঘদিন ধরে চলছে ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’। সার্ক দু সোলেইলের এই শোতে মাইকেলের গান, নাচ ও মঞ্চনির্ভর দৃশ্যভাষাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়। শোটি এরই মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি প্রদর্শনী করেছে এবং এর মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার গান। ‘থ্রিলার’, ‘বিলি জিন’, ‘ব্যাড’, ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’-এর মতো গান এখনো বিশ্বজুড়ে সমান জনপ্রিয়।
ডিজিটাল যুগে পুরোনো গান থেকেও নতুন করে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে একটি গান যত বেশি শোনা হয়, তত বেশি রয়্যালটি আসে। ফলে কয়েক দশক আগে প্রকাশিত মাইকেলের গান থেকেও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন আয়।
নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা তার গান শুনছে, পুরোনো ভক্তরা আবার ফিরে যাচ্ছেন প্রিয় গানের কাছে। ফলে সময়ের সঙ্গে মাইকেলের সংগীতের বাণিজ্যিক মূল্যও টিকে আছে।
মাইকেল জ্যাকসনের জনপ্রিয়তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখছে তার জীবন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাইকেল’। ২০২৬ সালে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত এই জীবনীভিত্তিক সিনেমা।
ছবিটি পরিচালনা করেছেন অঁতোয়ান ফুকুয়া। মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তার ভাতিজা জাফর জ্যাকসন।
একটি জীবনীভিত্তিক সিনেমার প্রভাব শুধু বক্স অফিসে সীমাবদ্ধ থাকে না। সিনেমা মুক্তির পর শিল্পীর গান শোনা, অ্যালবাম কেনা, মঞ্চনাট্য দেখা ও বিভিন্ন পণ্য কেনার প্রবণতাও বাড়তে পারে। ফলে মাইকেল জ্যাকসনের ব্র্যান্ডমূল্যও নতুন করে বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর পরও বিপুল আয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তার সংগীতের দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা। তার গান একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে নেই। কয়েক দশক পরও নতুন শ্রোতারা তা আবিষ্কার করছেন।
এর পাশাপাশি মাইকেল ছিলেন শুধু একজন গায়ক নন। তার নাচ, পোশাক, মিউজিক ভিডিও ও মঞ্চ পরিবেশনা তাকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করেছে।
জীবদ্দশায় করা সংগীতসম্পর্কিত বিনিয়োগগুলোও তার মৃত্যুর পর বিশাল সম্পদে পরিণত হয়েছে। তার এস্টেট সেই সম্পদকে সিনেমা, মঞ্চনাট্য, লাইভ শো, লাইসেন্সিং ও অন্যান্য ব্যবসায় ছড়িয়ে দিয়েছে।
আর আছে ভক্তদের আবেগ। কয়েক প্রজন্মের মানুষের স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার সঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের নাম জড়িয়ে আছে। সেই আবেগই তার মৃত্যুর এত বছর পরও তাকে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী করে রেখেছে।
মাইকেল জ্যাকসন । ছবি: সংগৃহীত
মাইকেল জ্যাকসন নেই ১৭ বছর ধরে। কিন্তু তার গান থামেনি, তাকে নিয়ে আলোচনা থামেনি। নতুন প্রজন্ম এখনো তার গান শুনছে, নাচ অনুকরণ করছে, তার জীবন নিয়ে সিনেমা দেখছে।
মৃত্যুর সময় যার ওপর ছিল প্রায় ৪৫ কোটি ডলারের ঋণ, মৃত্যুর পর সেই শিল্পীর এস্টেট আয় করেছে ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি। শুধু ২০২৫ সালেই এসেছে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
তাই মাইকেল জ্যাকসনের গল্প শুধু একজন সংগীতশিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি এমন এক শিল্পীর গল্প, যিনি মৃত্যুর পরও তার গান, সৃষ্টিশীলতা ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বিশাল এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে গেছেন। সত্যিই, ‘কিং অব পপ’র রাজত্ব থামেনি-বরং মৃত্যুর পরও তা নতুন নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিস্তৃত হচ্ছে।
এমএমএফ












