বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | সময়: রাত ৮:৩৭

নির্বাচনের আগে তুরস্ককে ‘নতুন শত্রু’ বানাচ্ছেন নেতানিয়াহু?

👁️ ১ Time View
Daraz horizontal banner

তেল আবিবের ব্যস্ত প্রধান সড়ক। সেখানে বিশাল এক বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে দেখা গেল ইরান, হিজবুল্লাহ ও নিউইয়র্কের মেয়রের সঙ্গে। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—তারা সবাই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে হারাতে চান।
এর কয়েকদিন পরেই তুরস্ককে ঘিরে ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের আবু আল-দাহার বিমানঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। ইসরায়েলের দাবি, সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি তৈরির প্রস্তুতি চলছিল।

আরও পড়ুন

তুরস্কের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে ইসরায়েল, যুদ্ধ কি সত্যিই আসছে?

এই দুই ঘটনা কাছাকাছি সময়ে ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, তুরস্ককে ঘিরে নেতানিয়াহুর কঠোর অবস্থান কি শুধুই নিরাপত্তার হিসাব? নাকি সামনে থাকা নির্বাচনও এতে ভূমিকা রাখছে?
নেতানিয়াহুর ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে দক্ষ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশই গড়ে উঠেছে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে।
তবে তিনি একই সঙ্গে একজন দক্ষ রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবেও পরিচিত। সামরিক সংকট ও নিরাপত্তা ইস্যুকে রাজনৈতিক সুবিধায় পরিণত করার সক্ষমতা তার রয়েছে বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
ইসরায়েলে সামনেই নির্বাচন। আর জনমত জরিপে নেতানিয়াহু ও তার রাজনৈতিক জোট এখন কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

ইসরায়েলে হঠাৎ খামেনি-এরদোয়ানের পাশে মামদানির ছবি, কারণ কী?

এ অবস্থায় নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে সেটি নির্বাচনি প্রচারের গতিপথ বদলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা।
ইসরায়েলের দাবি, তুরস্কের সামরিক প্রস্তুতি চলছিল
নেতানিয়াহু ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ অবশ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাদের বক্তব্য, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি তৈরির বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, তুরস্ক ওই বিমানঘাঁটিতে সেনাসদস্য, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ইসরায়েলের আশঙ্কা ছিল, এমন মোতায়েন সিরিয়ার আকাশসীমায় তাদের সামরিক তৎপরতার স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা: তুরস্কের উপস্থিতিতে আতঙ্কিত ইসরায়েল?

ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গেও শেয়ার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে তেল আবিব।
যুক্তরাষ্ট্রের দূতের বিরল সমালোচনা
তবে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও সমালোচনা এসেছে। সিরিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত এবং তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের হামলাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
পডকাস্টার মারিও নওফালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন একটি আশঙ্কার কথা বলেন, যেখানে ইসরায়েল হয়তো তুরস্ককে ইচ্ করে উত্তেজিত করতে চেয়েছে।
ব্যারাকের মতে, হামলাটি অত্যন্ত আগ্রাসী পদক্ষেপ হলেও নির্বাচনের আগে এটি রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুর জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

আরও পড়ুন

নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারে তৎপর তুরস্ক, রেড নোটিশ জারি করবে ইন্টারপোল?

এমন মন্তব্য ইসরায়েলের হামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়িয়েছে।
তুরস্কের পাল্টা অভিযোগ
তুরস্ক অবশ্য ইসরায়েলের ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি। নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রসারণবাদী ও অস্থিতিশীল নীতি অনুসরণের অভিযোগ করেছে আঙ্কারা।
তুরস্কের বক্তব্য, সিরিয়ার সঙ্গে তারা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য বৈধ ভিত্তিতে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে গাজা, লেবানন ও ইরান যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।

আরও পড়ুন

‘ঝড় আসছে’ / তুরস্ক-মিশরের সঙ্গে নতুন যুদ্ধের ইঙ্গিত ইসরায়েলি গুপ্তচরের

এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বলেছেন। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একাধিকবার গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু এরদোয়ানের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করেছেন।
নেতানিয়াহুর আক্রমণাত্মক ভাষা
সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে নেতানিয়াহুর ভাষা আরও কঠোর হয়েছে। গত শুক্রবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এরদোয়ানকে ‘নিজ দেশের জনগণকে নিপীড়নকারী ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ হিসেবে উল্লেখ করে।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তুরস্কের কাছে বিক্রির বিরোধিতাও করেছেন নেতানিয়াহু। তুরস্কের আঞ্চলিক ‘আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’র দাবি করে তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

ট্রাম্পকে তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রি না করার অনুরোধ নেতানিয়াহুর

ফলে তুরস্ককে ঘিরে ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক ভাষা—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে।
নিরাপত্তা হুমকি নাকি নির্বাচনি কৌশল?
ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলের মতে, দুটি ব্যাখ্যাই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে। তার মতে, ইসরায়েলের কাছে তুরস্কের সামরিক তৎপরতা নিয়ে সত্যিই উদ্বেগের কারণ রয়েছে।
সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য উপদেষ্টা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে উদ্বিগ্ন করেছে।
তবে একই সঙ্গে নেতানিয়াহু যে নতুন ও আগ্রাসী নিরাপত্তানীতি অনুসরণ করছেন, সেটিও স্পষ্ট বলে মনে করেন তিনি।

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পরবর্তী টার্গেট তুরস্ক?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা দর্শনের একটি বড় অংশ হলো সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে আগে থেকেই আঘাত করা। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার সীমান্তে নিরাপত্তা বলয় তৈরির নীতিও এর অংশ।
২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি বাফার জোন তৈরি করে। সেটি এখনো তাদের দখলে রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীরাও প্রশ্ন তুলছেন
বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ অবশ্য সামরিক অভিযানকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলেননি। তবে হামলার পর নেতানিয়াহু সরকারের বিজয়োল্লাসের সমালোচনা করেছেন তিনি।
লাপিদের বক্তব্য, মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজন হলে আঘাত করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আঘাত করার পর চুপ থাকাও জরুরি।
বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান অভিযানটিকে ‘উসকানিমূলক ও বিপজ্জনক’ বলেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক আরও কঠোর মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, এই উত্তেজনার মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের গন্ধ স্পষ্ট।
তার মতে, জনগণকে উদ্বিগ্ন করে এমন একের পর এক নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনই কি বদলে দেবে সমীকরণ?
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোট এখন জনমত জরিপে পিছিয়ে রয়েছে। তাই তার সমালোচকদের আশঙ্কা, নতুন কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এলে ভোটারদের মনোযোগ অর্থনীতি বা সরকারের অন্য বিতর্ক থেকে সরে যেতে পারে। নেতানিয়াহু তখন নিজেকে আবারও দেশের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হ্যারেলও মনে করেন, নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন—জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের হিসাব বদলে দিতে পারে।
বিশেষ করে ইরান, গাজা ও লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় সিরিয়া-তুরস্ক নতুন একটি সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
তাই তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য বাস্তব নিরাপত্তা উদ্বেগ হলেও, নির্বাচনের সময়সূচির সঙ্গে এর সংঘাতময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পুরোপুরি আলাদা করাও কঠিন।
সূত্র: সিএনএনকেএএ/

Daraz horizontal banner
technoviable
Daraz square banner
technoviable

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সম্পর্কিত পোস্ট