
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় হোটেলে আগুন লেগে আট বাংলাদেশির মৃত্যুর পর ভবনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, জরাজীর্ণ ভবনটিতে চলছিল হোটেলের রমরমা ব্যবসা। কিন্তু মানা হচ্ছিল না অগ্নিনিরাপত্তাসহ সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনো নিয়ম।
বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোরে ভবনটিতে থাকা ‘শিখা-ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে আট বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
আরও পড়ুন
কলকাতায় হোটেলে আগুন / বেঁচে ফেরা বাংলাদেশিরা জানালেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা
বাংলাদেশি নাগরিকরা চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণের জন্য কলকাতায় এলে থাকার জন্য সাধারণত নিউমার্কেট এলাকাকে বেছে নেন। এজন্য এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে একাধিক আবাসিক হোটেল। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসা বহু মানুষ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ‘শিখা-ইন’ হোটেলে অবস্থান করতেন। তুলনামূলক কম খরচে থাকার ব্যবস্থা থাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে হোটেলটির পরিচিতি ছিল।
ঘিঞ্জি ভবনে একাধিক হোটেল
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুরোনো ও স্যাঁতসেঁতে চারতলা ভবনটিতে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক হোটেল চলছিল। ভবনের প্রতি তলায় আলাদা আলাদা হোটেল পরিচালিত হতো।
ভবনের কক্ষগুলো ছিল আকারে ছোট। বড় বা প্রশস্ত কক্ষের পরিবর্তে ঘুপচি ধরনের একাধিক কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল।
পুরো ভবনে রয়েছে লোহার সিঁড়ি। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একটি লিফটও রয়েছে। তবে সেটি অত্যন্ত পুরোনো এবং ব্রিটিশ আমলের।
আরও পড়ুন
কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহত ৮ বাংলাদেশি, রয়েছেন নারী-শিশুও
এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই প্রতি তলায় চলত একাধিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি।
ছিল না অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা
স্থানীয়দের অভিযোগ, হোটেলটিতে অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও ছিল না বলে দাবি তাদের।
কলকাতা পৌরসভার নিয়মকানুনও হোটেল কর্তৃপক্ষ মানেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ভবনটির নির্মাণ ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো কলকাতা পৌরসভার অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনের ভেতরে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে এভাবে অতিরিক্ত কক্ষ তৈরি করা হয়েছে।
তাদের দাবি, কলকাতা পৌরসভার বিল্ডিং প্ল্যানের একাধিক নিয়ম এক্ষেত্রে মানা হয়নি। ফলে ভবনটি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এর মধ্যে একাধিক হোটেল ও অসংখ্য এসি চালু থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও বেড়ে গিয়েছিল।
অনিয়ম নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
এ ধরনের আবাসিক হোটেল কীভাবে এত দিন নিয়মবহির্ভূতভাবে চলল, এখন সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে এ ধরনের অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে ভবনের ভেতরে অতিরিক্ত কক্ষ তৈরি করে হোটেল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কী বললেন ফিরহাদ হাকিম
ঘটনা নিয়ে কলকাতা পৌরসভার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কলকাতায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর আগে তারাপীঠেও এমন ঘটনা ঘটেছে। কিছুদিন আগে দিল্লির একটি হোটেলেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।
ফিরহাদ হাকিম বলেন, এসব ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যু হলে বিষয়টি আরও দুঃখজনক হয়ে ওঠে। তার মতে, এ ধরনের হোটেল পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ‘এসওপি’ বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিজেপি তার ওপর দোষ চাপাবে, আর তিনি দিল্লির ওপর দোষ চাপাবেন—এভাবে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তৃতীয় পক্ষ দিয়ে অডিটের পরামর্শ
ফিরহাদ হাকিম আরও বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকার সময় এ ধরনের হোটেল ও ভবনে ফায়ার সেফটি অডিটের কথা বলেছিলেন।
তার মতে, শুধু সরকারি কর্মীদের দিয়ে নিয়মিত অডিট করানো সব সময় সম্ভব নয়। এজন্য তৃতীয় পক্ষ বা থার্ড পার্টির মাধ্যমে অগ্নিনিরাপত্তা অডিট করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ফায়ার ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকেও অডিটের ব্যবস্থা থাকা উচিত। সেই অডিটের ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো হোটেল পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কলকাতার নিউমার্কেট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়মিত যাতায়াত থাকায় ‘শিখা ইন’ হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে ওঠা প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে কলকাতার পুরোনো আবাসিক ভবনগুলোতে চলা হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ডিডি/কেএএ/












